শৈশব

135
শৈশব

শৈশব

লেখকঃ নুর হেলেন

ছেলেবেলায় সকাল সকাল মা উঠে তেল মিশিয়ে আটার কাঁই করতেন। আমরা ভাই বোনেরা সবেমাত্র আড়মোড়া ভেঙে তড়িঘড়ি স্কুলের জন্য তৈরী হতে শুরু করেছি। ততক্ষনে রান্নাঘর থেকে শোবার ঘরে মার গলা ভেসে আসতো।

“নাস্তা খাবিনা তোরা? স্কুলের ভ্যান এসে পড়বে তো”

চুলার পাশেই ভাই বোনেরা সব বাঁশের মোড়া পেতে বসতাম। মা লোহার তাওয়ায় চারকোনা পরোটা মেলে দিতেন। চামচে করে তেল ছিটিয়ে দিতেন পরোটার চারপাশে। কখনো সখনো আবার বয়াম থেকে ছোট টুকরো করে কেটে রাখা ডালডায় কড়া করে ভেজে নিতেন। ডালডার আরেক নাম হচ্ছে বনস্পতি।

আমাদের নাসারন্ধ্রে এসে সে সুবাস তখন পেটের ভেতর ধুন্ধুমার বাঁধিয়ে দিয়েছে। লম্বা হাতল ওয়ালা খুন্তি দিয়ে আরেক পাশ উল্টে দিতেই গ্যাস বেলুনের মতন ফুলে ঢোল হয়ে যেতো একেকটা পরোটা। সোনালী বাদামী রঙের গরম গরম পরোটা প্লেটে দিতেই ছোট ভাই বায়না শুরু করে দিতো।

“মা একটু চিনি দাও না”

মা প্লেটের একপাশে চা চামচে করে চিনি দিতেন। ওপরে মচমচে অথচ ভেতরে মোলায়েম পরোটা আঙুল দিয়ে ছিঁড়ে চিনি মিশিয়ে মুখে পুরে দিতাম একেকজন। পাশ থেকে দেখতাম মা আঁচলে ঘাম মুছছেন। চুলার পাশে সেই সকাল থেকে বসে। তবুও যেন ক্লান্তি স্পর্শ করেনা তাকে।

অনুরোধ করে বলতেন, “আলু ভাজি নে একটু” খাবোনা বলে আপত্তি তুললেই জোর করে মুখে ভরে দিতেন। বাধ্য হয়ে প্রবল অনিচ্ছায় গিলে নিতাম।

বলতেন, ” আলু খেলে শক্তি হয় জানিস, টিফিনও তো ঠিকমতো খাস না তোরা”

আস্ত একটা পরোটা খেয়ে শেষ করতেই সদর দরজা থেকে স্কুল ভ্যানের ক্রিং ক্রিং ধ্বনি কানে আসতো। শুকনো পরোটা খেয়ে জগ থেকে ঢগঢগ করে পানি খেতে খেতেই দেখতাম মা ব্যাগে টিফিন ঢুকিয়ে দিচ্ছেন।

কিন্তু তখন ও যেতাম না স্কুলে। আরো মিনিট দুয়েক ট্যাঁ ট্যাঁ করে ঘুরতাম তার পিছন পিছন।

” ও মা দুই টাকা দাও না”

“মা বলতেন, ওই তো টিফিন দিলাম, টাকা নেয়া ভালো না কিন্তু”

” আজ দাও শেষবার, আর একদিনও চাইবো না”

শেষে বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে দোয়েল পাখি আঁকা চকচকে দুই টাকার নোট গছিয়ে দিতেন হাতে।

এরপর এক দৌড়ে সোজা স্কুলের ভ্যানে গিয়ে উঠতাম।

উঠেই পাশে বসা প্রিয় বন্ধুটিকে বলতাম,

” বুট মামা আজ আসবে তো? আজ জমিয়ে ছোলা বুট আর লাঠি লজেন্স খাবো, তুই ক’টাকা এনেছিস রে?” পাশে থাকা বন্ধুটিও ব্যাগের পকেট থেকে নতুন কড়কড়ে নোট বের করতো। দেখতাম সেখানেও একটা দোয়েল পাখি আঁকা।

শৈশবের সেই দু’টাকার নির্ভেজাল আনন্দ এখন লক্ষ কোটি টাকায়ও মেলা দুষ্কর।

ছেলেবেলার এমন অসংখ্য সুখস্মৃতির মোড়কে, বড়বেলার সব অপুর্ণতাগুলি গচ্ছিত রেখে, দিব্যি পার করে দিচ্ছি জীবনের করাল সময়। এই তো জীবন।