মুরগীর রান

19
মুরগীর-রান

মুরগীর রান

লেখকঃ মমতাজ পারভিন

মুরগির রান কার থালে দিতেন মা? শুনে মায়ের মুখ বেদনায় নীল হয়ে চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। বড় আপাকে বকুনি দিয়ে বলি ছোট কালের অভ্যাস রয়েই গেল তোমার। কখন কোন কথা কথা বলতে হয় শিখলানা আজও। মা তখন আস্তে করে বলে, যুথিতো ঠিক কথাই বলেছে। মুরগির রান তো সব তোর ভাইদের থালে দিছি। তোদের থালে তো দেই নাই। মাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, ঘুমান। মা বলে, আমি এখন অনেক সুস্থ্য। আমাকে দেশে নিয়ে যা তোদের সংসার আছে। সব কিছুর আগে মা আপনি তারপর অন্যকথা বলে মায়ের মাথায় বিলি দিয়ে ঘুম পাড়ায়ে দেই।

আমরা ছয় ভাইবোন। চারবোন দুই ভাই। আমি সহ তিন বোন সরকারি কলেজে পড়াই। ছোটো বোনটা সরকারি কর্মকর্তা। বড় ভাই সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল তার পরেরটা ব্যাংক কমর্কর্তা। সবাই সচ্ছল। মায়ের যখন জরায়ু ক্যানসার ধরা পড়লো দেশে ডাক্তার দেখানো যত্ন নেওয়া সব আমরাই করেছি। চেন্নাইয়ে ক্যানসার হাসপাতালে সব বন্ধবস্ত করে মাকে নিয়ে এসছি। তিন মাস হলো। আরো কিছুদিন থাকতে হবে। চার বোন পালা করে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকি।

ভাইদের জন্য মায়ের যে কষ্ট লজ্জা তা আমাকে বার বার পুরনো দিনগুলিতে নিয়ে যায়। বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরের ভাই জগন্নাথে পড়তো। যতদিন ভাইয়েরা ঢাকায় থাকতো ততদিন বাসায় কোনো ভালো রান্না হতো না। মা মুরগি পালতো। মাকে আমি মাঝে মাঝে বলতাম, মুরগির গোসত খাইতে ইচ্ছে করছে। মা বলতো তোর ভাইয়েরা আসুক। মাকে বলতাম, আব্বাকে একটা বড় মাছ আনতে বলেন। সেখানেও একি কথা তোর ভাইয়েরা আসুক। শীতকালের পিঠা সেখানেও একি কথা শুনতাম।

ভাইয়েরা ছুটিতে বাড়িতে আসতো। আমার ছোটো দুই বোন খুশিতে অস্থির থাকতো কারণ প্রতিদিন কোন না কোন ভালো রান্না হবে। মুরগি রান্না হতো ঠিকই কিন্তু রান থান ভালো টুকু রেখে মা আমাদের বাদ বাকি দিয়ে বুঝ দিতো। বড় মাছের বেলায় একই হতো। সবার ছোটো বোনটা রাগারাগি করতো, মা বলতো তোরই তো বড় ভাই দুরে থাকে ভালো কিছু খায় না। ছোট বোন রাগে বলতো, আমরা বাসায় থেকে কি খাই? কি রান্না করেন?

আমার বাবা রাশভারী ছিলেন। কম কথা বলতেন। ২য় শ্রেনীর সরকারি কমর্কর্তা ছিলেন। বদলি হয়ে বাইরে বাইরে বেশি থাকতেন। বাবাকে ভয় পেতাম। তাই যোগাযোগ কম ছিলো। তাই আমাদের সব আবদার মায়ের কাছে করতে হতো। দেখা যেত ভাইদের সব চাহিদা মিটানোর পর আমরা বোনরা কিঞ্চিৎ পেতাম। তখন আমাদের মায়ের উপর খুব রাগ হতো। বাবার উপরও রাগ হতো। বান্ধবীদের কাছে কতো গল্প শুনতাম তাদের বাবারা কত খেয়াল করতো। কতো ভালো।

এভাবেই চাওয়া আর পাওয়া নিয়ে বড় হতে থাকি। পড়ালেখায় খুব মনোযোগী ছিলাম আমরা। ভালো ছাত্রী হিসেবে আমাদের বোনদের খুব সুনাম ছিলো। ছোট বোনটা অস্থির চিত্তের ছিলো। ছটফট করতো। কথা অনেক বলতো। একবার ছোটো বোনটা এক ছেলের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পরে মা এটা শুনে এমন মাইর দেয়। জ্বর এসে যায়। এটা দেখে আমার খুব রাগ হলো। মাকে বললাম বড় ভাইজান তো কলেজে পড়ার সময় প্রেম করলো তাকে তো মারলেন না। ইতিকে কেন এতো মারলেন। মা বললো, ছেলে আর মেয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমি তাই বলে চুপ করে যাই। মনে মনে বলি মাকে উদ্দেশ্য করে হয়তো একদিন বুঝবেন সব।

ভাইবোনরা সবাই পড়ালেখা শেষ করে যে যার পেশায় ঢুকে পড়ি। এদিকে বোনদের সবার বিয়ে হয়। ভাইদেরও বিয়ে হয়। সবাই ভালো আছি

হঠাৎ করে একদিন বাবা ব্রেন স্টোক করে মারা যান। মা একা হয়ে যান ব্যাংকার ভাই বদলি হয়ে মায়ের কাছে চলে আসে। তারপর সবাই মিলে বসে জমি ভাগ বাটোয়ারা করে। মায়ের অংশটুকু মাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বাবা আগেই বাড়ি টা মায়ের নামে দিয়েছিল। বেশ চলছিল সব। ছোটো ভাবি মাকে খুব যত্ন করে। মা খুশি। আমরাও খুশি। তারপর একদিন শুনি বাড়ি বাদে মায়ের অংশটুকু দুই ভাইকে লিখে দিছে। তাতেও আমরা খুশি। মা ভালো থাকুক।

কিছুদিন ধরে মাকে মনমরা হয়ে থাকতে দেখি। খোলাসা করে কিছু বলে না। ভাই ভাবি ভালো করে যত্ন করে না। রাতে মাঝে মাঝেই জ্বর আসে। একদিন খুব আসুস্থ্য হয়ে পরে। তারপর মাকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে সব টেস্ট করে দেখি মায়ের জরায়ু ক্যানসার। তারপর ভাইদের সাথে কথা বলি, কোলকাতা নিয়ে চিকিৎসা করার ব্যাপারে। ভাইরা সাড়া দেয় না। বিভিন্ন কথার মধ্য দিয়ে অপরাগতা বুঝায়।

বোনরা এক হয়ে সব বন্দোবস্ত করে চেন্নাইয়ের ক্যানসার হাসপাতালে নিয়ে আসি। আমার বর অসম্ভব ভালো মানুষ। অনেক সাহায্য করেছে।আর বোনদের বড়গুলো ভালো। সব মিলিযে তিন মাস ধরে চেন্নাইয়ে থেকে মায়ের চিকিৎসা করাচ্ছি। মা এখন অনেক ভালো আছে।

মায়ের ঘুম ভাংগে। মায়ের ডাকে পুরানো দিন থেকে ফিরে আসি। মা বলে, তোরা বিশ্বাস কর আমি অনেক ভালো আছি। তোরা আমাকে দেশে নিয়ে যা। ডাক্তারের সাথে কথা বলে চেকআপ করে কয়েকদিন পর আমরা দেশে চলে আসি।

সব বোনরা ধরি আমাদের কাছে থাকার জন্য। কিন্তু মা থাকে না বলে, তোর বাবা বাড়ি করে দিছে ওখানে থাকি তোরা খোজ খবর নিস। তারপরও মাকে বলে আমার বাসায় রাখি। তারপর মা একদিন নিজের বাড়ি চলে যায়। তখন বোনরা মিলে মাকে দেখাশুনার জন্য বয়স্ক একজন মহিলা রেখে দেই। আর মায়ের বাড়ির কাছে চাকরির সুবিধার্থে বাড়ি করেছি। প্রতিদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে মাকে দেখে আসবো মনে মনে ঠিক করে রাখি।

এরপর থেকে আমি যেহেতু মায়ের হাতের নাগালে তাই মা কলেজ যাওয়ার সময় দাড়ায়ে থাকতো ছলছল চোখে আর বলতো আজ মুরগি রান্না করছি। তোর জন্য মুরগির রান রেখেছি খেয়ে যা। মায়ের একথা শুনে চোখে পানি চলে আসে। আস্তে করে বলি ফেরার পথে খাবনি আর মনে মনে বলি, মা মুরগির রানের সেই মজাটা এখন আর পাবো কি?